লবঙ্গের উপকারিতা ও অপকারিতা

আসসালামু আলাইকুম,আজকে আমরা জানবো লবঙ্গের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে।

আপনি জানেন কি লবঙ্গ শুধু রান্নার স্বাদ বাড়াতে নয় লবঙ্গ খাওয়ার উপকারিতাও প্রচুর। লবঙ্গ গাছের শুকনো ফুলের কুড়িকে আমরা লবঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করি।

এর বৈজ্ঞানিক নাম হল সিজিজিয়াম অ্যারোম্যাটিকাম (Syzygium Aromaticum)। ঝাঁঝালো গন্ধ ও মশলাদার স্বাদের এই লবঙ্গে রয়েছে নানা রকমের ঔষধি উপাদান।

বহু যুগ ধরে নানা রকমের রোগ নিরাময় করতে এই লবঙ্গ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আজকের এই  পোস্টে আমরা আপনাকে লবঙ্গর উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জানাবো।

চলুন জেনে নেই,লবঙ্গের উপকারিতা ও অপকারিতা

লবঙ্গের উপকারিতা:

এ্যান্টি ব্যাকটেরিয়া :

গবেষণায় দেখা গেছে লবঙ্গের মধ্যে এ্যন্টি এ্যান্টি ব্যাকটেরিয়া গুণাগুণ রয়েছে। আর এই শক্তি যে কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই সংক্রমন থেকে বেঁচে থাকতে অনেকেই লবঙ্গ খেয়ে থাকেন। নিয়মিত লবঙ্গ খেলে যে কোন ধরনের ইনফেকশন থেকে বেঁচে থাকা যায়।

দাঁতের ব্যথা :

অনেকে দাঁতের ব্যথা সারাতে সাদা পাতা ব্যবহার করেন বা অন্য ঔষধ খেয়ে থাকেন। দাঁতের ব্যথা হলে কয়েকটি লবঙ্গ চিবিয়ে ব্যথা স্থানে লাগান বা অল্প পরিমাণ লবঙ্গ তেল নিয়ে দাঁতের গোড়ায় লাগান বা কয়েকটি লবঙ্গ দিয়ে চা খান। খুব সহজেই দাঁত ব্যথা ভাল হয়ে যাবে।

জ্বর নিবারণ :

  • লবঙ্গে থাকা ভিটামিন কে ও ই শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়।
  • ফলে শরীরে কোন ভাইরাস থাকতে পারে না বা আসতে পারে না।
  • তাই ভাইরাল জ্বর হলে লবঙ্গ সেবন করুন খুব তাড়াতাড়ি জ্বর ভাল হয়ে যাবে।
  • এমনকি নিয়মিত লবঙ্গ খেলে জ¦র হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে।

চোখ উঠা :

চোখ উঠলে ২-৩ টি লবঙ্গ থেঁতো করে আধা কাপ গরম পানিতে ২-৩ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে ছেঁকে নিয়ে এই পানি দিয়ে চোখ ধৌত করলে চোখর জ্বালাপোড়া থাকবে না এবং চোখ দিয়ে ময়লা বের হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া চোখ লাল হওয়া, চোখে পিচুটি পড়া রোগেও এই ব্যবস্থা উপকারী।

আরো পড়ুন: কালিজিরার উপকারিতা

মাথা ব্যথা :

মাথা ব্যথা সকাল বিকাল বা রাতে যখনই হোক না কেন এবং যে প্রকারেরই মাথা ব্যথা হোক না কেন লবঙ্গ চূর্ণ করে এক গ্রামের চার ভাগের এক ভাগ অল্প গরম পানি সহ দিনে ২-৩ বার খেলে মাথা ব্যথা ভাল হয়ে যাবে। মাথা ব্যথায় লবঙ্গ বেটে কপালে দিলেও মাথা ব্যথা কমে যায়।

অতিরিক্ত পিপাসা :

কারো অতিরিক্ত পিপাসা হলে ২৫ গ্রাম লবঙ্গ ৪ লিটার পানিতে সিদ্ধ করতে হবে। ২ লিটার থাকতে নামিয়ে ছেঁকে এই পানি অল্প অল্প পরিমাণ খেলে অতিরিক্ত পিপাসা দূর হয়ে যাবে।

মাংস হজম হওয়া :

যে কোন কারণে বেশী মাংস খেয়ে ফেললে দুশ্চিন্তা না করে কয়েকটি লবঙ্গ চিবিয়ে খেয়ে ফেলুন খুব তাড়াতাড়ি মাংস হজম হয়ে যাবে।

হজমে সমস্যা :

যাদের যে কোন খাবারে বা গুরুপাক খাবারে হজমে সমস্যা রয়েছে তারা খাবারের আগে এক কাপ লবঙ্গ চা পান করুন দেখবেন খুব তাড়াতাড়ি হজম হয়ে যাবে। নিয়মিত খেলে হজম শক্তি বৃদ্ধি পাবে। আর সমস্যা থাকবে না।

লিভার শক্তিশালী করে :

লবঙ্গে থাকা এ্যান্টি অক্সিডেন্ট শরীরে প্রবেশ করে শরীরে জমে থাকা টক্সিনগুলো বা শরীরে লুকিয়ে থাকা ঘুমন্ত হত্যাকারীকে বের করে দেয়। ফলে লিভার সহ শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ শক্তিশালী হয়। তাই সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত লবঙ্গ খাওয়া জরুরী।

সাইনাস ইনফেকশন :

নিয়মিত লবঙ্গ খেলে সাইনাসের সমস্যা কমে যাবে। সাইনাসের সমস্যা থাকলে লবঙ্গ তেলের নস্যি নিতে পারেন।

সাধারণ ঠান্ডা কাশি :

ঠান্ডা কাশি অ্যাজমা সাইনাস সব খানেই লবঙ্গ চা উপকারী। লবঙ্গ দিয়ে চা খান এই রোগ গুলো ভাল হয়ে যাবে।

ত্বকে সংক্রমণ :

ত্বকে কোন ধরনের সংক্রমণ হলেই এই জায়গায় লবঙ্গের রস লাগাতে হবে অথবা লবঙ্গ চা লাগাতে হবে। খুব তাড়াতাড়িই কষ্ট কমে যাবে।

আথ্রাইটিসে :

  • আথ্রাইটিসের যন্ত্রনা কমাতে লবঙ্গ চা উপকারী। নিয়মিত লবঙ্গ চা খেলে আথ্রাটিসের ব্যথা কমে যাবে।
  • তাছাড়া এক কাপ লবঙ্গ চা কয়েক ঘন্টা ফ্রিজে রেখে দিতে হবে।
  • তারপর বের করে ব্যথার স্থানে ঐ ঠান্ডা চা ২০ মিনিট লাগালে ব্যথা কমে যাবে।
  • শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট ব্যথা ও ফোলা কমাতেও এই নিয়ম কার্যকরী।
  • যে সমস্ত জয়েন্টে ব্যথা রয়েছে তার জন্য একটু বেশী পরিমাণ লবঙ্গ নিয়ে তাওয়ায় সামান্য ভেজে নিন।
  • ভেজে নেওয়া লবঙ্গগুলো গরম থাকতেই হালকা কাপড়ে পুটলি বেঁধে ব্যথার স্থানে ছেক দিন ব্যথা কমে যাবে।

আরো পড়ুন: গ্রীন টি এর উপকারিতা

গর্ভনিরোধ :

প্রতিদিন একটি করে লবঙ্গ চিবিয়ে খেলে গর্ভবতী হওয়ার আশংকা থাকে না। তাই স্ত্রীদের লবঙ্গ সেবনে সতর্ক থাকা উচিত।

সর্দি :

সর্দি রোগে লবঙ্গ বেটে নাকে ও কপালে প্রলেপ দিলে সর্দি ভাল হয়ে যায়।

অরুচি:

পিত্ত বা শ্লেষ্মার বিকৃতিতে অরুচি রোগ হয়। এই অবস্থায় লবঙ্গ অল্প ভেজে নিয়ে চূর্ণ করতে হবে। এই চূর্ণ ২৫০ মিঃ গ্রামঃ পরিমান নিয়ে সামান্য গরম পানি সহ সকাল বিকাল খেলে অরুচি দুর হয়ে যাবে।

পেট ফাঁপা( লবঙ্গের উপকারিতা ও অপকারিতা):

  • পেট ফাঁপা ও পেটে ভুটভাট শব্দ হয়।
  • লবঙ্গ  চূর্ণ ২৫০ মিঃ গ্রামঃ পরিমাণ নিয়ে সামান্য গরম পানি সহ সকাল বিকাল খেলে অরুচি দূর হয়ে যাবে।
  • সশব্দে মল ত্যাগ, পাতলা দাস্ত হলেও এই নিয়মে উপকার পাওয়া যায়।
  • পেটে বায়ু জমে আছে উর্ধ অধ কোন দিকেই যাচ্ছে না এই অবস্থায় ৩-৪ টি লবঙ্গ বেটে পানি সহ খেলে বায়ু বেরিয়ে যাবে।

গলার ক্ষত:

লবঙ্গ পুড়িয়ে ধোয়াটা মুখে টানলে গলার ক্ষত ভাল হয়ে যায়।

কফ ছাড়া কাশি:

রক্তে ইয়োসিনোফিল কণিকার সংখ্যা বা পরিমাণ বেড়ে গেলে কাশি হতে পারে।

এমতাবস্থায় দুপুর ও রাত্রে খাবারের পর ২৫০ মিঃ গ্রাম মাত্রায় সামান্য গরম পানি সহ কিছু দিন খেলে আশ্চর্যজনকভাবে ইয়োসিনোফিল কণিকার সংখ্যা বা পরিমাণ কমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে কাশি সেরে যায়।

বাত:

আমবাত, কটি বাত সহ বিভিন্ন প্রকার বাত রোগে লবঙ্গ তেল মালিশ করলে এবং সাথে প্রতিদিন ২ বার ২৫০ মিঃগ্রাম লবঙ্গ চূর্ণ সামান্য গরম পানি সহ খেলে উপকার পাওয়া যায়।

অজীর্ণ ও বমি ভাব :

  • খাওয়ার পর খাদ্য জীর্ণ হওয়ায় বমি বমি ভাব পেটেও সামান্য ব্যথা।
  • মুখে তিতা ভাব চলে আসে।
  • এমতাবস্থায় ২৫০ মিঃগ্রাম লবঙ্গ চূর্ণ কয়েক ফোটা পানি দিয়ে পেষ্ট বানিয়ে এই পেষ্ট সামান্য গরম পানি সহ সকাল, দুপুর ও রাতের খাবারের পর খেলে উপকার পাওয়া যায়।

প্রচন্ড ট্রেস :

যে কোন কারণে প্রচন্ড উৎকণ্ঠায় আছেন একটি লবঙ্গ মুখে দিয়ে চুষে চুষে খেয়ে ফেলুন একটু পরেই মেজাজ ফুরফুরে হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে লবঙ্গ চাও খেতে পারেন।

বুকে ব্যথা :

সামান্য কাশি আছে সাথে সামান্য বুকে ব্যথা। অনেকে এতে ভয় পেয়ে যায়। এমতাবস্থায় ২৫০ মি. গ্রাম লবঙ্গ গুড়া অল্প গরম পানি সহ সকাল বিকাল সেবন করুন কাশিও চলে যাবে বুকের ব্যথাও থাকবে না।

মুখের দুর্গন্ধ :

যাদের মুখে দুগন্ধ রয়েছে কয়েকটি লবঙ্গ নিয়ে চিবুতে থাকুন, মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যাবে।

ব্রণ :

তাজা লবঙ্গের গুড়া মধুর সাথে মিশিয়ে ব্রণের উপরে লাগালে ব্রণ ভালো হয়ে যায়।

মশা তাড়াতে :

লেবু কেটে এর মধ্যে লবঙ্গ লাগিয়ে ঘরের মশা থাকার যায়গাগুলোতে রেখে দিন মশা থাকবে না।

পিঁপড়া তাড়াতে :

চিনির বৈয়ামে কয়েকটি লবঙ্গ রেখে দিন বৈয়ামে পিপড়া আসবে না।

কানে সংক্রমণ :

কানে কোন সংক্রমণ বা ব্যথা হলে রাতে কয়েক ফোটা লবঙ্গ তেল কানে দিয়ে রাখুন কানের ব্যথা থাকবে না সংক্রমণও কমে যাবে।

চুল পড়া :

নিয়মিত ব্যবহারের তেলের সাথে লবঙ্গ তেল মিশিয়ে ব্যবহার করলে চুল পড়া বন্ধ হয় এবং চুলের ঘনত্ব বাড়ে।

লবঙ্গের অপকারিতা:

যেকোনো জিনিসের মত লবঙ্গও অতিরিক্ত মাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলে তার কিছু  অপকারিতা দেখা যেতে পারে।

  • অতিরিক্ত পরিমানে লবঙ্গ খেলে তা স্বাস্থ্যের ওপর নানা রকমের সমস্যা সৃষ্টি করে যেমন রক্তপাত, নিম্ন রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়া, অ্যালার্জি ইত্যাদি ।
  •  গর্ভাবস্থায় বা স্তন্যপান করানোর সময় অতিরিক্ত লবঙ্গ না খাওয়াই ভালো।

তবে যাই হোক না কেন, লবঙ্গে রয়েছে নানা ঔষধি উপাদান যা স্বাস্থ্য, ত্বক ও চুলের জন্যে খুবই প্রয়োজনীয়।

সংক্রমণ থেকে শুরু করে ব্রণ সরানো পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই উপকার প্রদান করে এই লবঙ্গ।

তাই স্বল্প পরিমাণে লবঙ্গ প্রত্যেকেরই প্রতিদিন খাওয়া প্রয়োজন

আরো পড়ুন: শিমুলের মূলের উপকারিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *