মুলতানি মাটির উপকারিতা – Jana Joruri

মুলতানি মাটির উপকারিতা: ত্বক পরিচর্চায় মুলতানি মাটির ব্যবহার খুব প্রচলিত। মুলতানি মাটির ফেস প্যাক ত্বকের তেল তেলে ভাব দূর করে এবং  উজ্জ্বলতা বাড়ায়।  তেল শোষণ করার ক্ষমতা থাকায় এটি ব্রণ কমাতে উপকারী।

চলুন জেনে নেই , মুলতানি মাটির অপকারিতা ও অপকারিতা:

ত্বকের যত্নে  মুলতানি মাটির উপকারিতা:

১. ত্বককে চকচকে করে তোলে


ত্বকের ধুলো ময়লা দূর করে ত্বককে ভেতর থেকে সজীব করে তুলে ত্বককে চকচকে রাখতে সাহায্য করে মুলতানি মাটি দিয়ে তৈরী প্যাক। আসুন জেনেনি এর সম্পর্কে।

উপকরণ:

  • এক চামচ মুলতানি মাটি
  • দই এক চামচ
  • হলুদ

বানানোর পদ্ধতি :

  1. তিনটি উপকরণকে ভালোভাবে মিশিয়ে একটি ঘন পেস্ট বানিয়ে নিন।
  2. তারপর মুখ ভালো করে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিয়ে প্যাকটি লাগিয়ে রাখুন।
  3. কমপক্ষে পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট রাখুন ও তারপর পরিষ্কার করে নিন।
  4. ভালো ফলাফল পেতে হলে সপ্তাহে দুবার ব্যবহার করুন এই প্যাকটি।

২. তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে


শুধু তৈলাক্ত ত্বক নয় , সব ত্বকের জন্যই ত্বক এক্সফলিয়েট অর্থাৎ স্ক্র্যাব করতে মুলতানি মাটি উপযুক্ত। নিচে এক্ষেত্রে উপযোগী একটি ফেস প্যাকের সম্পর্কে উল্লেখ করা হল।

উপকরণ:

  • এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটি
  • গোলাপ জল

বানানোর পদ্ধতি :

  1. এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটির সাথে গোলাপ জলের সাথে মিশিয়ে নিয়ে পেস্ট বানিয়ে মুখে লাগিয়ে নিন।
  2. তারপর হালকা হাতে ম্যাসাজ করে কমপক্ষে পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট রেখে দিয়ে হালকা উষ্ণ জলে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
  3. তারপর জেল ধরণের ময়েশ্চরাইজার লাগিয়ে নিন।
  4. তবে সপ্তাহের দুই বারের বেশি এই প্যাক লাগাবেন না।

উপকারিতা:

ত্বককে মৃত কোষের সমস্যা থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করে ও রোমকূপকে বন্ধ হতে দেয় না এই প্যাকটি ।

৩. শুষ্ক ত্বকের জন্য


নিচে শুষ্ক ত্বকের এই উপযোগী একটি ফেস প্যাকের সম্পর্কে উল্লেখ করা হল।

আরো পড়ুন: অর্জুন গাছের উপকারিতা

উপকরণ:

  • এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটি
  • মধু

বানানোর পদ্ধতি :

  1. এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটির সাথে মধুর সাথে মিশিয়ে নিয়ে পেস্ট বানিয়ে মুখে লাগিয়ে নিন।
  2. তারপর হালকা হাতে ম্যাসাজ করে কমপক্ষে পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট রেখে দিয়ে হালকা উষ্ণ জলে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
  3. তারপর ক্রিম ধরণের ময়েশ্চরাইজার লাগিয়ে নিন।
  4. তবে সপ্তাহের দুই বারের বেশি এই প্যাক লাগাবেন না।

উপকারিতা:

ত্বককে আদ্র রাখতে সাহায্য করে আর এটি সপ্তাহে দুই বার ব্যবহার করলে ত্বক হয়ে উঠবে চকচকে ও মোলায়েম।

৪. অ্যাকনের সমস্যা দূর করতে


অ্যাকনের সমস্যা দূর করতে একটি উপযোগী ফেস প্যাকের কথা নিচে উল্লেখ করা হল।

উপকরণ:

  • এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটি
  • চন্দনকাঠ গুঁড়ো বা চন্দন তেল
  • গোলাপ জল

আরো পড়ুন: শিউলি পাতার উপকারিতা

বানানোর পদ্ধতি :

  1. এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটির সাথে চন্দনকাঠ গুঁড়ো বা চন্দন তেলের সাথে মিশিয়ে নিয়ে পেস্ট বানিয়ে মুখে লাগিয়ে নিন।
  2. তারপর যে জায়গাগুলিতে অ্যাকনে হয়েছে সেখানে লাগিয়ে কমপক্ষে পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট রেখে দিয়ে হালকা জলে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
  3. তবে সপ্তাহের দুই বারের বেশি এই প্যাক লাগাবেন না।

উপকারিতা:

চন্দনে থাকে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরী উপাদান  যা অ্যাকনে ঠিক করতে উপযোগী। তাই যারা অ্যাকনের সমস্যায় ভুগছেন, তারা অবশ্যই এই ফেস প্যাক ব্যবহার করতে ভুলবেন না।

৫. ত্বক এক্সফলিয়েট করতে

ত্বক এক্সফলিয়েট বা স্ক্রাবিং করতে মুলতানি মাটি ব্যবহার করলে খুবই উপকার পাবেন। এক কাপ মুলতানি মাটির সাথে এক কাপ ওটমিল মিশিয়ে নিন। চাইলে নিম পাউডার যোগ করতে পারেন।

৬. দাগ দূর করতে

ব্রণর কারণে বা অন্য কোনো কারণে সারা মুখে ছোপ দাগের সৃষ্টি হয়। ত্বকের এই দাগকে নির্মূল করতে মুলতানি মাটির সঙ্গে টমাটোর রস মিশিয়ে একটি পেস্ট বানিয়ে নিন। তারপর সেই পেস্টটি মুখে লাগিয়ে পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর ধুয়ে ফেলুন মুখ । এক্ষেত্রে ২ চামচ মুলতানি মাটির সঙ্গে ২ চামচ টমাটোর রস, ১ চামচ চন্দন গুঁড়ো এবং ১ চামচ হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে পেস্টটি বানাতে নিন। সপ্তাহে দুই বার ব্যবহার করার চেষ্টা করুন, তাতে ত্বকে দাগ ছোপের সমস্যা কমতে পারে।

৭. ত্বক পরিষ্কার রাখতে

অল্প দুধ নিয়ে তাতে পরিমান মতো মুলতানি মাটি মিশিয়ে নিন ও তারপর পেস্টটি মুখে মেখে নিন। দশ থেকে পনেরো মিনিট রেখে দিয়ে ভালো করে মুখ ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে দুই বার ব্যবহার করুন। এতে ত্বক থাকবে পরিষ্কার পরিছন্ন ।

৮. ত্বকের ট্যান থেকে মুক্তি পেতে

অল্প ঘরে পাতা দই নিয়ে তাতে পরিমান মতো মুলতানি মাটি মিশিয়ে নিন ও তারপর পেস্টটি মুখে মেখে নিন। দশ থেকে পনেরো মিনিট রেখে দিয়ে ভালো করে মুখ ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে দুই বার ব্যবহার করুন।

 ৯. ক্ষত চিহ্নের দাগের সমস্যাতে

চন্দন কাঠ গুঁড়ো ও মুলতানি মাটিতে অল্প গোলাপ জল দিয়ে একটি পেস্ট বানিয়ে ক্ষত চিহ্নের দাগের জায়গায় নিয়মিত লাগাতে থাকুন। দেখবেন ধীরে ধীরে সেটি কমতে থাকবে।

১০. ব্ল্যাকহেড বা ওয়াইটহেডের সমস্যা থাকলে

ব্ল্যাকহেড বা ওয়াইটহেডের সমস্যা থাকলে তা দূর করতে মুলতানি মাটি সক্ষম কারণ এতে এক্সফলিয়েটিং উপাদান আছে।

১১. ত্বককে উজ্জ্বল করতে

ঘরে পাতা দইয়ের সাথে মুলতানি মাটি মিশিয়ে অল্প লেবুর রস দিয়ে মুখে মেখে নিন ও দশ থেকে পনেরো মিনিট পর জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত এই প্যাক লাগালে ত্বক হয়ে উঠতে পারে উজ্জ্বল।

চুলের ক্ষেত্রে মুলতানি মাটির উপকারিতা


১. শুষ্ক চুলের জন্য

শুষ্ক চুলের জন্য উপযোগী নিচে একটি প্যাকের সম্পর্কে উল্লেখ করা হল।

উপকরণ:

আরো পড়ুন: লবঙ্গের উপকারিতা

  • পাঁচ টেবিল চামচ মুলতানি মাটি
  • আধ কাপ দই
  • লেবুর রস
  • দুই টেবিল চামচ মধু

বানানোর পদ্ধতি :

  1. সব উপকরণগুলি একসঙ্গে মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে নিন।
  2. তারপর স্ক্যাল্প ও পুরো চুলে ভালো করে মেখে নিন ও কমপক্ষে কুড়ি মিনিট রেখে দিন।
  3. তারপর একটি মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন।
  4. কন্ডিশনার মাখতে ভুলবেন না কিন্তু। সপ্তাহে এক বা দুই বার মাখুন।

উপকারিতা:

লেবুর রসে থাকা ভিটামিন সি চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে আর এই প্যাকে থাকা দই স্ক্যাল্পে হওয়া যেকোনো ইনফেকশনকে সারিয়ে তোলে।

২. স্প্লিট এন্ডস দূর করতে


স্প্লিট এন্ডস দূর করতে নিচে একটি প্যাকের সম্পর্কে উল্লেখ করা হল।

উপকরণ:

  • তিন টেবিল চামচ অলিভ অয়েল
  • চার টেবিল চামচ মুলতানি মাটি
  • এক কাপ দই

বানানোর পদ্ধতি :

  1. রাতে চুলে ভালো করে অলিভ অয়েল মেখে ঘুমিয়ে পড়ুন।
  2. পরদিন সকালে উঠে দই ও মুলতানি মাটি দিয়ে একটি পেস্ট বানিয়ে নিন।
  3. তারপর চুলে ভালো করে মেখে কমপক্ষে কুড়ি মিনিট রেখে হালকা উষ্ণ জলে চুল ধুয়ে ফেলুন এবং পরদিন শ্যাম্পু করুন।
  4. সপ্তাহে একবার এটি ব্যবহার করুন।

উপকারিতা:

অলিভ অয়েল ও দই উভয়েই চুলকে মোলায়েম ও কন্ডিশন করতে সাহায্য করে।

৩. খুশকি মুক্ত করতে


 খুশকি মুক্ত করতে নিচে একটি প্যাকের সম্পর্কে উল্লেখ করা হল।

উপকরণ:

  • ছয় টেবিল চামচ মেথি
  • চার টেবিল চামচ মুলতানি মাটি
  • লেবুর রস

বানানোর পদ্ধতি :

  1. মেথিকে সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখুন ও তারপর সকালে উঠে তার পেস্ট বানিয়ে নিন।
  2. এরপর মুলতানি মাটি ও লেবুর রস মিশিয়ে একটি পেস্ট বানিয়ে নিন।
  3. প্রথমে স্ক্যাল্পে ভালো করে ম্যাসাজ করে নিন ও চুলেও মেখে নিন।
  4. কমপক্ষে তিরিশ মিনিট রেখে দিন ও পারলে শাওয়ার ক্যাপ ব্যবহার করুন।
  5. তারপর একটি মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। কন্ডিশনার মাখতে ভুলবেন না কিন্তু।
  6. সপ্তাহে একবার মাখুন এই প্যাক ।

উপকারিতা:

মেথি খুশকি  দূর করতে অনবদ্য ও তার সাথে মুলতানি মাটি চুলকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।

মুলতানি মাটির স্বাস্থ্যে উপকারিতা:


১. রক্ত চলাচল সঠিক রাখতে

জানা যায়, রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করতে মুলতানি মাটি ব্যবহার করা হয়। অল্প জল নিয়ে তার মধ্যে মুলতানি মাটি মিশিয়ে সেটি দেহের কোনো অংশে লাগালে ওই অংশের রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে।

২. গরম কমাতে

যখনই আপনি ত্বকের কোনো জায়গায় মুলতানি মাটির প্যাক লাগান, দেখবেন ঠান্ডা ভাব অনুভূত হয়। তাই গরমকালে মুলতানি মাটি দিয়ে তৈরী প্যাক লাগালে অনায়েসেই ঠান্ডা ভাব অনুভব করতে পারেন ও শরীরের তাপ কমতে পারে।

৩. হট ও কোল্ড কম্প্রেস

হট ও কোল্ড কম্প্রেসের সময় মুলতানি মাটি ব্যবহার করা যায়। পেশিতে টান ধরলে বা পিরিয়ডসের ব্যথা হলে ঠান্ডা বা গরম জলের সাথে মুলতানি মাটি মিশিয়ে সেই জায়গায় লাগিয়ে দিতে পারেন।  তবে এ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

৪.  অ্যান্টি-সেপটিক হিসেবে

মুলতানি মাটিতে থাকে অ্যান্টি-সেপটিক উপাদান  । তাই ত্বক জ্বালা করলে বা অল্প কেটে গেলে দুধের সঙ্গে অল্প মুলতানি মাটি মিশিয়ে লাগিয়ে দিন।

মুলতানি মাটি ব্যবহার করার কিছু টিপস


  • ভুলেও এটি খাবেন না। কারণ এটি শ্বাসনালী বন্ধ করে দিতে পারে বলে জানা যায়  । এটি শুধুমাত্র ত্বকে লাগানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।
  • মুলতানি মাটি সবসময় একটি মুখ বন্ধ কৌটোয়ে রাখুন। লক্ষ্য রাখবেন, সরাসরি যাতে সূর্যালোক না পড়ে এই কৌটোয়ে।
  • বাচ্চাদের থেকে দূরে রাখুন।
  •  এটি ব্যবহার করা শুরু করার আগে অবশ্যই ত্বকের একটু অংশে পরীক্ষা করে নেবেন, যাতে পরে কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয়।

আরো পড়ুন: কালিজিরার উপকারিতা

তবে মুলতানি মাটি ব্যবহার করা শুরু করার আগে একবার ত্বক-বিশেষজ্ঞর সঙ্গে পরামর্শ করে নেবেন।

মুলতানি মাটির অপকারিতা:


  • আমরা জানি, কোনো কিছুই বেশি ব্যবহার করা উচিত না।
  • এক্ষেত্রেও আপনারও পরিমান মতো মুলতানি মাটি ব্যবহার করা উচিত, কখনোই ভাববেন না বেশি পরিমানে মুলতানি মাটি ব্যবহার করলে এর উপকারিতাও বাড়বে।
  • উপরে প্রত্যেকটি প্যাক কতবার ব্যবহার করতে পারেন, তার উল্লেখ আছে।
  • জানা যায়, কোনো ভাবে মুখে প্রবেশ করলে শ্বাসনালী বন্ধ করে দিতে পারে এটি  ।

মুলতানি মাটির গুনাগুণ সম্পর্কে তো জানলেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন এটি কতটা স্বাস্থ্যকর আপনার ত্বক ও চুলের জন্য। এবার থেকে এটি নিজের পরিচর্যার রুটিনে যোগ করতে ভুলবেন না কিন্তু। নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *