ফুলকপি চাষ পদ্ধতি

ফুলকপি চাষ পদ্ধতি: শীতের জনপ্রিয় সবজি  ফুলকপি। তরকারি বা কারি ও স্যুপ তৈরি করে, বড়া ভেজে ফুলকপি খাওয়া হয়।এ দেশের প্রায় সর্বত্র ফুলকপির চাষ হয়। তবে টাঙ্গাইল জেলা আগাম জাতের ফুলকপি চাষের জন্য বিখ্যাত।

জেনে নিন, ফুলকপি চাষ পদ্ধতি:

মাটি:

ফুলকপি চাষের জন্য সুনিকাশযুক্ত উর্বর দোয়াশ ও এটেল মাটি সবচেয়ে ভাল।

ফুলকপির জাতের নাম:


এ দেশে এখন ফুলকপির পঞ্চাশটিরও বেশি জাত পাওয়া যাচ্ছে। শীতকালেই আগাম, মধ্যম ও নাবী মৌসুমে বিভিন্ন জাতের ফুলকপি আবাদ করা যায়। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালে চাষের উপযোগী জাতও আছে।

ফুলকপির আগাম জাত:

অগ্রাহনী, আর্লিস্নোবল, সুপার স্নোবল, ট্রপিক্যাল স্নো-৫৫, সামার ডায়মণ্ড এফ ১, স্নো কুইন এফ ১, হিট মাস্টার  ও হাইব্রিড জাত। এসব জাতের বীজ শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে বুনতে হয়।

ফুলকপির মধ্যম আগাম জাত:

পৌষালী, রাক্ষুসী, স্নোবল এক্স, স্নোবল ওয়াই, হোয়াইট টপ, স্নো ওয়েভ, বিগটপ, বিগশট, মোনালিসা এফ ১, চন্ড্রিমা ৬০ এফ ১ ইত্যাদি। ভাদ্র ও আশ্বিন মাস হলো এসব জাতের বীজ বোনার উপযুক্ত সময়।

ফুলকপির নাবী জাত

মাঘী বেনারসি, ইউনিক স্নোবল, হোয়াইট মাউন্টেন, ক্রিস্টমাস, এরফার্ট ও হাইব্রিড জাত। এসব জাতের বীজ বোনার উপযুক্ত সময় হলো আশ্বিন-কার্তিক মাস।

ফুলকপি চারা তৈরি:

ফুলকপি চারা তৈরি
https://janajoruri.com/

ফুলকপির চারা বীজতলায় উৎপাদন করে জমিতে লাগানো হয়। বীজতলার আকার ১ মিটার পাশে ও লম্বায় ৩ মিটার হওয়া উচিত। সমপরিমাণ বালি, মাটি ও জৈবসার মিশিয়ে ঝুরাঝুরা করে বীজতলা তৈরি করতে হয়।

দ্বিতীয় বীজতলায় চারা রোপণের আগে ৭/৮ দিন পূর্বে প্রতি বীজতলায় ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ও ১০০ গ্রাম এমওপি সার ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। পরে চারা ঠিকমত না বাড়লে প্রতি বীজতলায় প্রায় ১০০ গ্রাম পরিমাণ ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দেয়া ভাল।

ফুলকপির চারা রোপণ:

বীজ গজানোর ১০-১২ দিন পর গজানো চারা দ্বিতীয় বীজতলায় স্থানান্তর করতে হয়। চারায় ৫-৬টি পাতা হলেই তা রোপণের উপযুক্ত হয়।

সাধারণত ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারা রোণ করা হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব দেয়া লাগে ৬০ সেন্টিমিটার বা ২ ফুট এবং প্রতি সারিতে চারা থেকে চারার দূরত্ব দিতে হবে ৪৫ সেন্টিমিটার বা দেড় ফুট। চারা রোপণের সময় সতর্ক থাকতে হবে যেন শিকড় মুচড়ে বা বেঁকে না যায়।

এতে চারার মাটিতে প্রতিষ্ঠা পেতে দেরী হয় ও বৃদ্ধি কমে যায়।

আরো পড়ুন: তরমুজ চাষ পদ্ধতি

ফুলকপির সারের পরিমাণ:

সারের নাম সারের পরিমাণ/প্রতি শতকে প্রতি হেক্টরে
  ইউরিয়া ১.০-১.২ কেজি ২৫০-৩০০ কেজি
  টি এস পি ০.৬-০.৮ কেজি ১৫০-২০০  কেজি
  এমওপি ০.৮-১.০ কেজি ২০০-২৫০ কেজি
  বোরাক্স ২৮-৪০ গ্রাম ৭.০-১০.০ কেজি
  গোবর ৬০-৮০ কেজি ১৫-২০ টন

ফুলকপির সার প্রয়োগ পদ্ধতি:

জমি তৈরির সময় অর্ধেক গোবর সার, পুরো টিএসপি, অর্ধেক এমওপি এবং বোরন সার প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক গোবর সার চারা রোপণের ১ সপ্তাহ আগে মাদায় দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর চারা রোপণ করে সেচ দিতে হবে।

ইউরিয়া এবং বাকি অর্ধেক এমওপি ও বোরন সার ৩ কিসি-তে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম কিসি-র সার দিতে হবে চারা রোপণের ৮-১০ দিন পর, দ্বিতীয় কিসি-র সার দিতে হবে চারা রোপণের ৩০ দিন পর এবং শেষ কিসি-র সার দিতে হবে ৫০ দিন পর।

তবে পুরো বোরাক্স বা বোরন সার জমি তৈরির সময় দিয়ে দিলেও অসুবিধে নেই। আর সে সময় দিতে না পারলে পরবর্তীতে ১ম ও ২য় কিস-ও সার দেয়ার সময় প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০-১৫ গ্রাম বোরিক পাউডার গুলে পাতায় স্পে করে দেয়া যায়। তবে সকালে শিশির ভেজা পাতায় যেন দানা সার না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা :

সার দেয়ার পরপরই সেচ দিতে হবে। এ ছাড়া জমি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। জমিতে পানি বেশি সময় ধরে যেন জমে না থাকে সেটাও খেয়াল করতে হবে। সার দেয়ার আগে মাটির আস্তর ভেঙে দিয়ে নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে।

বিশেষ পরিচর্যা(ফুলকপি চাষ পদ্ধতি):

ফুলকপি গাছের সারি মাঝে সার দেয়ার পর সারির মাঝখানের মাটি তুলে দুপাশ থেকে গাছের গোড়ায় টেনে দেয়া যায়। এতে সেচ ও নিকাশের সুবিধা হয়।

তবে ফুলকপির ফুল সাদা রাখার জন্য কচি অবস্থায় চারদিক থেকে পাতা টেনে বেঁধে ফুল ঢেকে দিতে হবে। সূর্যের আলো সরাসরি ফুলে পড়লে ফুলের রঙ তথা ফুলকপির রঙ হলুদাভ হয়ে যাবে।

ফুলকপির রোগ ও প্রতিকার:


ফুলকপির লেদা পোকা:

লেদা পোকা,
লেদা পোকা

পোকা গাছের কচি পাতা, ডগা ও পাতা খেয়ে নষ্ট করে।

লেদা পোকা প্রতিকার:

  • পোকার ডিম ও লেদা হাত দারা বাছাই করা।
  • ফুলকপি চাষের জমি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
  • পোকার আক্রমণ বেশি হলে অনিমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা। যেমন- সাইপারমেথ্রিন ( রিপকট/ কট/রেলোথ্রিন ) ১ মিলি/ লিটার পানি অথবা ক্যারাটে ১ মিলি/ লিটার পানিতে দিয়ে স্প্রে করতে হবে।

ফুলকপির কাটুই পোকা:

কাটুই পোকা
কাটুই পোকা

কাটুইপোকার কীড়া চারা গাছের গোড়া কেটে দেয়।

কাটুই পোকা প্রতিকার:

  • জমিতে সন্ধ্যার পর বিষটোপ ব্যবহার করতে হবে অর্থাৎ (১ কেজি চালের কুঁড়া বা গমের ভূসির সাথে ২০ গ্রাম সেভিন নামক কীটনাশক পানি বা চিটাগুড়ের সাথে ব্যবহার)।
  • জমিতে চাষের সময় দানাদার কীটনাশক ব্যবহারকরতে হবে। যেমন-ডায়াজিনন ১৩ কেজি/ হেক্টর অথবা কার্বোফুরান ১০ কেজি/ হেক্টর দিতে হবে।
  • এছাড়াও ক্লোরপাইরিফস ( ডার্সবান/ লর্সবান ) ২ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

আরো পড়ুন: টমেটো চাষ পদ্ধতি

ফুলকপির জাবপোকা:

জাব পোকা
জাব পোকা

জাবপোকা গাছের পাতা ও কচি ডগার রস শুষে খায়।

জাবপোকা প্রতিকার:

  • ফুলকপি চাষের জমি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
  • জৈব বালাইনাশক ব্যবহার। যেমন- নিম পাতার রস, আতা গাছের পাতার রস, সাবানের গুড়া পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা যায়।
  • আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক দিতে হবে। যেমন-ইমিডাক্লোপ্রিড ( টিডো /ইমিটাফ ) ০.৫ মিলি/লিটার পানি অথবা সবিক্রন ১ মিলি/লিটার পানিতে দিয়ে স্প্রে করতে হবে।

ফুলকপির গোড়া পচা রোগ:

লক্ষণ:

  • আক্রান্ত চারার গোড়ার চারদিকে পানিভেজা দাগ দেখা যায় ।
  • ক্রমণের দুইদিনের মধ্যে চারা গাছটি ঢলে পড়ে ও আক্রান্ত অংশে তুলারমতো সাদামাইসেলিয়াম দেখা যায় ও অনেক সময় সরিষার মত ছত্রাকের অনুবীজ পাওয়া যায়।
  • শিকড় পচে যায়, চারা নেতিয়ে পড়ে গাছ মারা যায় ।
  • স্যাতস্যাতে মাটি ও মাটির উপরিভাগ শক্ত হলে রোগের প্রকোপ বাড়ে ।
  • রোগটি মাটিবাহিত বিধায় মাটি, আক্রান্ত চারা ও পানির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে ।
  • চারা টান দিলে সহজে মাটিথেকে উঠে আসে।

গোড়া পচা রোগ প্রতিকার:

  • পরিমিত সেচ ও পর্যাপ্ত জৈব সার প্রদান করা ও পানি নিস্কাশনের ভালো ব্যবস্থা রাখা।
  • সরিষার খৈল প্রতি হেক্ট্ররে ৩০০ কেজি হারে প্রয়োগ করতে হবে।
  • প্রতি লিটার পানিতে ইপ্রোডিয়ন বা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন: রোভরাল ২ গ্রাম বা অটোস্টিন ১ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে মাটিসহ ভিজিয়ে দিতে হবে। অথবা
  • প্রতি লিটার পানিতে কপার অক্সিকোরাইড ৪গ্রাম /১ লিটার পানি + স্ট্রেপ্টোমাইসিন ১ গ্রাম/১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২ বার স্প্রে করতে হবে।
  • ম্যানকোজেব + কার্বেণ্ডাজিম ( কম্প্যানিয়ন ) বা ম্যানকোজেব ( ইণ্ডোফিল এম ৪৫) ২ গ্রাম/ লিটার পানিতে দিয়ে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।

ফুলকপির কার্ড বা মাথা পচা রোগ:

ফুলকপির কার্ড বা মাথা পচা রোগ,ফুলকপি
ফুলকপির কার্ড বা মাথা পচা রোগ

লক্ষণ:

  • ফুলকপির কার্ডে প্রথমে বাদামি রঙের গোলাকৃতি দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে একাধিক দাগ মিশে বড় দাগের সৃষ্টি করে।
  • ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে কার্ডে দ্রুত পচন ধরে নষ্ট হয়ে যায়।
  • আক্রান্ত কার্ড বা মাথা থেকে খুব কম পুষ্পমঞ্জরি বের হয়। ফলে এটি খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যায়।

আরো পড়ুন: বরবটি চাষ পদ্ধতি

ফুলকপির কার্ড বা মাথা পচা রোগ প্রতিকার:

  • সুস্থ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
  • বীজ বপনের আগে প্রোভ্যাক্স বা কার্বেনডাজিম বা নইন প্রতি কেজি বীজে ২ গ্রাম হারে দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
  • ইপ্রোডিয়ন এবং কার্বেনডাজিম ছত্রাকনাশক প্রতিটি পৃথক পৃথকভাবে ০.২% হারে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে,ওষুধ প্রয়োগের ৫ দিন পর পর্যন্ত ফসল তোলা যাবে না।

ফসল তোলা ও ফলন:

সাদা রঙ ও আঁটো সাঁটো থাকতে থাকতেই ফুলকপি তুলে ফেলা উচিত। মাথা ঢিলা ও রঙ হলদে ভাব ধরলে দাম কমে যায়। একর প্রতি ফলন ১৫-২৫ টন, হেক্টরে ৩৫-৬০ টন।

আরো পড়ুন: ফুলকপির উপকারিতা ও অপকারিতা

এই ছিলো ফুলকপি চাষ পদ্ধতি  ভালো লাগলে ,অবশ্যই লাইক কমেন্ট শেয়ার করবেন।

Photo Credit: Pixabay

সূত্র : অনলাইন

One Comment on “ফুলকপি চাষ পদ্ধতি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *