পালং শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা

আসসালামু আলাইকুম ,আজকে আমরা জানবো পালং শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা।

পালং শাক যেমন খেতে ভালো, তেমনি কাজেও দারুণ। পালং শাকের উপকারিতা অনেক । তাই খাদ্য তালিকায় অবশ্যই রাখুন পালং শাক।

জেনে নিন পালং শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা ও পুষ্টিগুণ।

পালং শাকের পুষ্টিগুণ:

প্রতি ১০০ গ্রাম পালং শাকে থাকে –

খাদ্যশক্তি – ২৩ কিলোক্যালরি

আঁশ – ০.৭ গ্রাম

কার্বোহাইট্রেড – ৩.৬ গ্রাম

শর্করা – ০.৪ গ্রাম

প্রোটিন – ২.২ গ্রাম

ভিটামিন এ – ৪৬৯ মাইক্রোগ্রাম

ভিটামিন সি – ২৮ মিলিগ্রাম

লিউটিন – ৫৬২৬ মাইক্রোগ্রাম

ফোলেট – (বি৯) ১৯৬ মাইক্রোগ্রাম

ভিটামিন কে – ৪৬৩ মাইক্রোগ্রাম

পটাশিয়াম – ২০৮ মিলিগ্রাম

ফ্ল্যাভোনয়েড – ১০ রকমেরও বেশি ধরনের

ক্যালসিয়াম – ৯৯ মিলিগ্রাম

নিকোটিনিক অ্যাসিড – ০.৫ মিলিগ্রাম

রাইবোফ্লোবিন – ০.০৮ মিলিগ্রাম

থায়ামিন – ০.০৩ মিলিগ্রাম

অক্সালিক অ্যাসিড – ৬৫২ মিলিগ্রাম

ফসফরাস – ২০.৩ মিলিগ্রাম

আয়রন – ১১.২ মিলিগ্রাম

 বিটাকেরোটিন

পালং শাকের উপকারিতা:

পালং শাক চাষ পদ্ধতি
পালং শাক

ওজন হ্রাসে :

শাকটিতে মজুত রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার এবং অ্যন্টিঅক্সিডেন্ট। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় আয়রন, ফলেট, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং আরও নানাবিধ ভিটামিন এবং খনিজ। এইগুলি শরীরে প্রবেশ করার পর ওজন হ্রাসের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। তাই নিয়মিত এই শাক খাদ্য তালিকায় রাখলে অতিরিক্ত মেদ ঝরে যায়।

 কোলেস্টেরল কমাতে :

পালং শাকে যে সমস্ত পুষ্টিগুণ রয়েছে তা শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

লবণের ভারসাম্যে :

পালং শাকে রয়েছে বিপুল পরিমাণে পটাশিয়াম। এই খনিজটি শরীরের সোডিয়াম বা লবণের হারিয়ে যাওয়া ভারসাম্য ফিরে আনতে সাহায্য করে।

 রক্তচাপ কমাতে :

পালং শাকে থাকা পটাশিয়ামের কারণে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়। স্বাভাবিক ভাবেই রক্তচাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা হ্রাস পায়। পালং শাকে থাকা ফলেটও রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

কোলনের জন্য :

পালং শাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং বিটা কেরোটিন রয়েছে। এই দুই উপাদান কোলনের কোষগুলোকে রক্ষা করে।

বাত ও অস্টিওপোরোসিস :

বাতের ব্যথা, অস্টিওপোরোসিসের ব্যথা যন্ত্রণায় প্রদাহনাশক হিসেবে পালং শাক খুব ভালো কাজ করে।

মাইগ্রেশন, মাথাব্যথা :

মাইগ্রেনের মতো সাংঘাতিক মাথার ব্যথায় পালং শাকের খাদ্যগুণ খুবই উপকার দেয়।

আরো পড়ুন: কলমি শাকের উপকারিতা

আরথ্রাইটিস :

শরীরে বিভিন্ন গাঁটের বা জয়েন্টের রোগ নিরাময়ে পালং শাক খুবই কাজ দেয়। তার মধ্যে যেমন আরথ্রাইটিসের মতো সমস্যাগুলিতে পালং শাক উপকারী। তা ছাড়াও বাতের ব্যথা, জয়েন্টের ব্যথা ইত্যাদির ঝুঁকি কমায়।

স্মৃতিশক্তি :

এতে থাকা পটাশিয়াম, ফলেট এবং অ্যন্টিঅক্সিডেন্ট যদি প্রতিদিন শরীরে যায়, তা হলে মস্তিষ্কের বিশেষ বিশেষ অংশের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়।

রোগ প্রতিরোধ :

বিভিন্ন ধরনের খাদ্যগুণের কারণে পালং শাকে রয়েছে শরীরে রোগ প্রতিরোধক শক্তি গড়ে তোলার ক্ষমতা।

হজম ক্ষমতা :

পালং শাকে থাকা অ্যামাইনো অ্যাসিড হল এমন একটি উপাদান, যা মেটাবলিজম রেট বাড়াতে সাহায্য করে। তার ফলে হজম ক্ষমতার উন্নতি হয়।

কোষ্ঠকাঠিন্য :

পালং শাক পেট পরিষ্কার রাখতে অপরিহার্য। এইটি সহজে হজম শক্তি বাড়ায়। ফলে তা অনায়াসেই মল প্রস্তুতে সহায়তা করে এবং পেটে জমে থাকা মল বের করে দিতেও সাহায্য করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।

কিডনির জন্য :

বিশেষজ্ঞের মতে, পরিমাণ মতো ও নিয়মিত পালং শাক খেলে তার মধ্যে থাকা খাদ্যগুণের ফলে কিডনিতে পাথর থাকলে, তা গুঁড়ো হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ক্যান্সার প্রতিরোধে :

পালং শাকে ১৩ প্রকার ফাভোনয়েডস আছে। এই ফাভোনয়েডস ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে এটি খুবই কার্যকর।

ঋতুর সমস্যায় :

পালং শাকে প্রচুর ভিটামিন ও মিনারেলস আছে। তাই পালং শাক নিয়মিত খেলে মাসিকজনিত সমস্যা দূর হয়।

ক্ষয়রোধে পালং শাকের উপকারিতা:

পালং শাকে প্রচুর ক্যালসিয়াম আছে, দাঁত ও হাড়ের ক্ষয়রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

জন্ডিসে :

পালং শাক জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষ উপকারী।

চোখের জন্য :

চোখের জন্যও পালং শাক উপকারী। নিয়মিত পালং শাক খেলে দৃষ্টিশক্তি বাড়ে।

স্কিন ডিজিজ :

পালং শাকে রয়েছে নিয়োক্সেথিন এবং ভায়োল্যাক্সানথিন নামক দু’টি অ্যন্টিইনফ্লেমেটরি উপাদান। এই উপাদানগুলি দেহের পাশাপাশি ত্বকের ভিতরে প্রদাহের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ফলে নানাবিধ স্কিন ডিজিজের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

হৃদরোগ :

পালং শাকে লুটেইন নামক পদার্থ রয়েছে যা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কম করে হৃদরোগের ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করে। এর মধ্যে থাকা ফলিক অ্যসিড সুস্থ কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পেশির জন্য :

পালং শাকের ভিতরে থাকা নানা অ্যন্টিঅক্সিডেন্ট, হার্টের পেশির পাশাপাশি সারা শরীরের অন্যান্য পেশির শক্তি বাড়াতেও বিশেষ ভূমিকা নেয়। ফলে সার্বিকভাবে শরীরের কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

অতিবেগুলি রশ্মি :

পালং শাকের ভিতরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি। এটি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির কারণে ত্বকের ক্ষতি রোধ করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ত্বক পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা যেমন কমে। সঙ্গে স্কিন ক্যানসারের মতো রোগের সম্ভাবনা দূর হয়।

ব্রণের সমস্যা পালং শাকের উপকারিতা:

পালং শাক নিয়ে তার সঙ্গে অল্প জল মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে । তা ভাল করে মুখে লাগিয়ে কম করে ২০ মিনিট রাখতে হবে। শুকিয়ে গেলে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এই পদ্ধতি প্রতিদিন করলে ভেতরে জমে থাকা ক্ষতিকর উপাদান বেরিয়ে যাবে।  স্বাভাবিকভাবেই ব্রণের সমস্যা কমবে। নিয়মিত পালং শাকের রসও কিন্তু সমান উপকার দেয়।

শরীর ঠাণ্ডা করতে :

দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে, শরীরের অকারণ গরম ভাব কমিয়ে ঠাণ্ডা ও স্নিগ্ধ রাখে পালং শাক।

চুল পড়ায় :

অতিরিক্ত হারে চুল পড়লে চুলের পরিচর্যায় পালং শাক কাজে লাগে। শাকটিতে উপস্থিত আয়রন, চুলপড়ার মাত্রা কমানোর পাশাপাশি দেহের লোহিত কণিকার ঘাটতি দূর করতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ ক্ষেত্রে পালং শাকের রস চুলে লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হয়। তাতে উপকার পাওয়া যায়। তা ছাড়া নিয়মিত পালং শাকের রস উপকার দেয়।

যৌবন ধরে রাখতে :

বয়সের ছাপ লুকানোর জন্য পালং শাক খুবই ভালো একটি খাবার। পালং শাকে আছে প্রচুর পরিমাণ অ্যন্টিঅক্সিডেন্ট। এই অ্যন্টিঅক্সিডেন্টের কাজই হল কোষের ক্ষয়রোধ করে শরীরকে তারুণ্যদীপ্ত রাখা। সুস্থসবল সতেজ রাখা।

আরো পড়ুন: লাউয়ের উপকারিতা ও অপকারিতা

ফর্সা ত্বকে :

পালং শাকে উপস্থিত ভিটামিন কে এবং ফলেট ত্বককে ফর্সা করে। সঙ্গে চোখের নীচের ডার্ক সার্কেলকে দূর করে। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে।

ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকে :

আগেও আলোচনা করা হয়েছে যে পলং শাকে রয়েছে বিপুল পরিমাণে পটাশিয়াম। এই খনিজটি শরীরে প্রবেশ করা মাত্র সোডিয়াম বা লবণের হারিয়ে যাওয়া ভারসাম্য ফিরে আসে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়। প্রসঙ্গত, পালং শাকে থাকা ফলেটও ব্লাড প্রেসার স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই তো হাই ব্লাড প্রেসারে ভুগতে থাকা রোগীদের নিয়মিত পালং শাকের রস খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা।

পালং শাকের অপকারিতা:

পালং শাক অতিরিক্ত খাওয়া হলে নানান শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। পুষ্টি-বিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে অতিরিক্ত পালংশাক খাওয়ার প্রভাব সম্পর্কে জানানো হয়েছে। জানা না থাকলে জেনে নিন পালং শাকের ক্ষতির দিকগুলো।

বৃক্কে পাথর হওয়ার ঝুঁকি :

পালং ‘অক্সালেটস’ যৌগ সমৃদ্ধ যা পাথর সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। তাই পালং খাওয়া কিডনি বা বৃক্কে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। মূত্রে ‘অক্সালাট’ বৃদ্ধির ফলেই মূলত কিডনিতে পাথর দেখা দেয়।

রক্ত পাতলা করতে বাধা দেয় :

রক্ত ঘন হতে বাধা তৈরি করে রক্ত পাতলা হওয়া ওষুধ। পালংশাক ভিটামিন কে সমৃদ্ধ, যা রক্ত ঘনীভূত করে। ফলে অতিরিক্ত পালংশাক গ্রহণ করলে রক্ত পাতলা হওয়া ওষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

খনিজ শোষণে প্রভাব : 

পালং খাওয়া কেবল বৃক্কে পাথর হওয়ার ঝুঁকিই বাড়ায় না পাশাপাশি খনিজ শোষণেও প্রভাবিত করতে পারে। ‘অক্সালেটস’ এক ধরনের পুষ্টি-পরিপন্থি উপাদান যা খনিজ শোষণে বাধা দেয়। বিশেষত, ক্যালসিয়াম ও লৌহ শোষণে বাধা দিতে পারে এই উপাদান।

বাতের ব্যথা :

বাত বা আর্থ্রাইটিসের প্রদাহ যা মূলত শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি থাকার কারণে হয়ে থাকে। পালংশাকে আছে পরিশোধক উপাদান যৌগ যা ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়ায়। ফলে বাতের ব্যথা বৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আরো পড়ুন: করলার উপকারিতা ও অপকারিতা

রক্ত চাপ কমাতে পারে : 

পালংশাক রক্তচাপ কমানোতে প্রভাব রাখতে পারে।

তবে পরিমাণে বেশি পালংশাখ খাওয়া হলে তা রক্তচাপ অনেক বেশি কমিয়ে ফেলতে পারে।

ফলে দুর্বল ও বমি বমি ভাব অথবা বুক ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *