গম চাষ পদ্ধতি – Jana Joruri

গম চাষ পদ্ধতি: আমাদের দেশে খাদ্য হিসাবে ভাতের পরই আটা ময়দার স্থান। আর এই আটা বা ময়দা গম থেকে তৈরি হয়। দানা ফসল হিসেবে বাংলাদেশে গমের স্থান তৃতীয়। আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় খাদ্য উৎপাদন অনেক কম। খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি গমের উৎপাদন, সঠিক চাষের মাধ্যমে বাড়ানো সম্ভব।

নিম্নে গম চাষ পদ্ধতি দেওয়া হল:

গম বোনার উপযুক্ত সময়


অগ্রহায়ণের প্রথম সপ্তাহ থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। তবে উত্তরাঞ্চলে শীতের প্রকোপ বেশি থাকায় অগ্রহায়ণের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময়েও গম বোনা যাবে। দেরিতে বোনা হলে গমের ফলন কমে যায়। জমিতে সারিতে বা ছিটিয়ে গম বীজ বপন করা যায়। দানা ফসল হিসেবে বাংলাদেশে গমের স্থান তৃতীয়। গম আবাদের সুবিধা হলো- চাষ পদ্ধতি সহজ, বেশি সেচের প্রয়োজন হয় না, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম এবং রোগ ও পোকার আক্রমণের তেমন সমস্যা নেই।
২০১১-২০১২ মৌসুমে সারা দেশে ৩ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর জমিতে গমের চাষ হয় এবং গম উৎপাদন হয় ৯ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন। দেশে একরপ্রতি গমের গড় ফলন মাত্র ১১২২ কেজি, আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে যা সহজেই ১৬০০-২০০০ কেজিতে বৃদ্ধি করা সম্ভব।

জমি নির্বাচন :


পলি দো-আঁশ, বেলে দো-আঁশ এবং এঁটেল দো-আঁশ মাটি গম চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত।

অধিক লবণাক্ত জমি গম চাষের জন্য উপযোগী নয়।

জমি তৈরি (গম চাষ) :


আমন ধান কাটার পর মাটির অবস্থা বুঝে পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টর দিয়ে উত্তম রূপে জমি তৈরি করতে হবে।

আরো পড়ুন: লাল শাক চাষ পদ্ধতি

জমিতে রস কম থাকলে জমি তৈরির আগে একটি হালকা সেচ দিতে হবে।

সার প্রয়োগ :


ভালো ফলনের জন্য জমি তৈরির আগে একরপ্রতি ৩০০০ থেকে ৪০০০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট প্রয়োগ করতে হবে। একরপ্রতি ৬০-৭০ কেজি ইউরিয়া, ৬০-৭০ কেজি টিএসপি, ৪০-৪৫ কেজি এমওপি ও ৪৫-৫০ কেজি জিপসাম শেষ চাষের আগে জমিতে ছিটিয়ে চাষ ও মই দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। বোরন ও দস্তার ঘাটতি থাকলে একরপ্রতি ২.৫ কেজি বরিক এসিড এবং ৫.০ কেজি জিংক সালফেট শেষ চাষের সময় জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে নির্ধারিত মাত্রায় বরিক এসিড প্রয়োগ করলে গমে চিটার পরিমাণ কম হবে। অম্লীয় মাটিতে গম চাষের বেলায় (অম্লত্ব ৫.০ – ৬.০ হলে ) একরপ্রতি ৪০০ কেজি হারে ডলোচুন গম বপনের দু’সপ্তাহ আগে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম সেচের পর মাটি ভেজা থাকা অবস্থায় একরপ্রতি ৩০-৩৫ কেজি ইউরিয়া সার দুপুর বেলা উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

জাত নির্বাচন :


ভালো ফলনের জন্য নতুন উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতগুলোই নির্বাচন করা উচিত। জাতগুলো হলো- প্রদীপ, বিজয়, সুফী, শতাব্দী, সৌরভ ও গৌরব।

বারি গম ২৪ (প্রদীপ) :

এটি তাপসহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল জাত। জাতটি ২০০৫ সালে আনুমোদন পায়। দেশের সব অঞ্চলে বপন উপযোগী জাতটির বৈশিষ্ট্য হলোÑ গাছের উচ্চতা ৯৫-১০০ সেমি. কুশির সংখ্যা ৩-৪টি, পাতা চওড়া, গাঢ় সবুজ, শীষ বের হতে ৬৪-৬৬ দিন, পাকতে ১০২-১১০ দিন সময় লাগে, শীষ লম্বা এবং প্রতি শীষে দানার সংখ্যা ৪৫-৫০টি, দানার রঙ সাদা চকচকে আকারে বড়, হাজার দানার ওজন ৪৮-৫৫ গ্রাম, জাতটি তাপসহিষ্ণু এবং দেরিতে বপন করলেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। একরপ্রতি ফলন ১৭২০-২০৪০ কেজি।

বারি গম ২৩ (বিজয়) :

এটি তাপসহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল জাত। জাতটি ২০০৫ সালে আনুমোদন পায়। দেশের সব অঞ্চলে এ জাতটি উপযুক্ত সময় ও দেরিতে বপন উপযোগী। জাতটির বৈশিষ্ট্য হলো- গাছের উচ্চতা ৯৫-১০৫ সে.মি., কুশির সংখ্যা ৪-৫টি, পাতা চওড়া হালকা সবুজ, শীষ বের হতে ৬০-৬৫ দিন, পরিপক্ব হতে ১০৩-১১২ দিন সময় লাগে, শীষ লম্বা, প্রতি শীষে দানার সংখ্যা ৩৫-৪০টি, দানার রঙ সাদা চকচকে আকারে বড়, হাজার দানার ওজন ৪৭-৫২ গ্রাম এবং জাতটি তাপসহিষ্ণু, দেরিতে বপন করলেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। একরপ্রতি ফলন ১৭২০-২০০০ কেজি।

বারি গম ২২ (সুফি) :

এটি একটি তাপসহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল জাত। জাতটি ২০০৫ সালে আনুমোদন পায়। দেশের সব অঞ্চলে বপন উপযোগী জাতটির বৈশিষ্ট্য হলো- গাছের উচ্চতা ৯০-১০২ সে.মি., কুশির সংখ্যা ৪-৫টি, পাতা চওড়া গাঢ় সবুজ, শীষ বের হতে ৫৮-৬২ দিন সময় লাগে, পাকতে ১০০-১১০ দিন সময় লাগে, শীষ লম্বা এবং প্রতি শীষে দানার সংখ্যা ৪৫-৫০টি, দানার রঙ সাদা চকচকে, আকারে ছোট, হাজার দানার ওজন ৩৬-৪২ গ্রাম, জাতটি তাপসহিষ্ণু ও চিটা প্রতিরোধী এবং দেরিতে বপন করলেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। একরপ্রতি ফলন ১৪৪০-১৯২০ কেজি।

বারি গম ২১ (শতাব্দী) :

জাতটি ২০০১ সালে আনুমোদন পায়। দেশের সব অঞ্চলে বপন উপযোগী জাতটির বৈশিষ্ট্য হলো- গাছের উচ্চতা ৯৫-১০০ সে.মি., কুশির সংখ্যা ৫-৬টি, পাতার রঙ হালকা সবুজ, নিশান পাতা আধা হেলানো ও হালকা সবুজ, শীষ বের হতে ৬৫-৬৮ দিন, পাকতে ১০৫-১১২ দিন সময় লাগে, শীষ লম্বা এবং প্রতি শীষে দানার সংখ্যা ৪০-৪৫টি, দানার রঙ সাদা, আকারে বড়, হাজার দানার ওজন ৪৬-৪৮ গ্রাম, পাকার সময় শীষ হলুদ হলেও নিশান পাতা ও শীষের নিচের দ- বেশ সবুজ থাকে, জাতটি তাপসহিষ্ণু, দেরিতে বপন করলেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। একরপ্রতি ফলন ১৪৪০-২০০০ কেজি।

বারি গম ২০ (গৌরব) :

এটি একটি উচ্চফলনশীল জাত। জাতটি ১৯৯৮ সালে আনুমোদন পায়। দেশের সব অঞ্চলে বপন উপযোগী জাতটির বৈশিষ্ট্য হলোÑ গাছের উচ্চতা ৯০-১০২ সেমি., কুশির সংখ্যা ৫-৬টি, পাতা গাঢ় সবুজ, নিশান পাতা খাড়া, সরু এবং ঈষৎ মোচড়ানো, শীষ বের হতে ৬৪-৬৬ দিন, পাকতে ১০০-১০৮ দিন সময় লাগে, শীষ লম্বা, অগ্রভাগ সরু এবং প্রতি শীষে দানার সংখ্যা ৪৫-৫০টি, দানার রঙ সাদা চকচকে, আকাড়ে বড়, হাজার দানার ওজন ৪০-৪৮ গ্রাম, জাতটি তাপসহিষ্ণু, দেরিতে বপন করলেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। একরপ্রতি ফলন ১৪৪০-১৯২০ কেজি।

বারি গম ১৯ (সৌরভ) :

বারি উদ্ভাবিত একটি উচ্চফলনশীল জাত। জাতটি ১৯৯৮ সালে আনুমোদন পায়। দেশের সব অঞ্চলে বপন উপযোগী জাতটির বৈশিষ্ট্য হলোÑ গাছের উচ্চতা ৯০-১০০ সেমি., কুশির সংখ্যা ৩-৪টি, পাতা চওড়া, হেলানো গাঢ় সবুজ, কা- শক্ত এবং ঝড়-বৃষ্টিতে সহজে হেলে পড়ে না। নিশান পাতার নিচের দিকে মোমের মতো পাতলা আবরণ থাকে, শীষ বের হতে ৬০-৭০ দিন, পাকতে ১০২-১১০ দিন সময় লাগে, শীষ লম্বা এবং প্রতি শীষে দানার সংখ্যা ৪২-৪৮টি, দানার রঙ সাদা চকচকে, আকারে বড়, হাজার দানার ওজন ৪০-৪৫ গ্রাম, জাতটি তাপসহিষ্ণু, দেরিতে বপন করলেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। একরপ্রতি ফলন ১৪০০-১৮৪০ কেজি।

বীজের পরিমাণ (গম চাষ পদ্ধতি ):


বীজ গজানো ক্ষমতা শতকরা ৮০ ভাগ হলেও একরপ্রতি ৫০ কেজি বীজ বপন করতে হবে।

বীজ গজানোর ক্ষমতা ৮০ ভাগের কম হলে প্রতি এক ভাগ কমের জন্য হেক্টরপ্রতি এক কেজি করে অতিরিক্ত বীজ বুনতে হবে।

গজানো ক্ষমতা ৬০ ভাগের নিচে হলে ওই বীজ বপন করা যাবে না।

বীজ শোধন :


বপনের আগে প্রতি কেজি বীজ তিন গ্রাম প্রভেক্স বা ভিটাভেক্স ২০০ দ্বারা শোধন করতে হবে।

বীজ শোধনের ফলে চারা সবল ও সতেজ হয় এবং গম গজানোর হার ও ফলন বৃদ্ধি পায়।

বপনের সময় :


নতুন উদ্ভবিত জাতগুলো বোনার উপযুক্ত সময় হলো- অগ্রহায়ণের প্রথম সপ্তাহ থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত।

উত্তরাঞ্চলে শীতের প্রকোপ বেশি থাকায় অগ্রহায়ণের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময়েও গম বোনা যাবে।

দেরিতে বোনার কারণে গমের ফলন কমে যায়।

উপযুক্ত সময়ের পরে গম বুনলে প্রতি একদিন সময়ের জন্য হেক্টরপ্রতি প্রায় ৪০-৪৪ কেজি ফলন কম হয়।

বীজ বপন পদ্ধতি :


সারিতে বা ছিটিয়ে গম বীজ বপন করা যায়। সারিতে বপনের জন্য জমি তৈরির পর ছোট লাঙল দিয়ে ২০ সেমি. দূরে দূরে সারি তৈরি করে এবং ৩-৪ সেমি গভীরে বীজ বুনতে হবে। আগাম বপনের জন্য পাওয়ার টিলারচালিত বীজ বপন যন্ত্রের সাহায্যে গম আবাদ করা যায়। যন্ত্রটির সুবিধা হলোÑ ধান কাটার পরপর একই সময়ে চাষ, বীজ বপন ও মই দেয়ার কাজ করা যায়। যন্ত্রটিতে ২০ কেজি বীজ রাখার মতো একটি হপার থাকে এবং ২০ সেমি. দূরে দূরে ৬ সারিতে ৩-৪ সেমি. গভীরে বীজ বোনা যায়। বীজ বোনার সঙ্গে সঙ্গে বীজ ঢেকে দেয়া হয় করে বলে পাখি কম ক্ষতি করে এবং শতকরা প্রায় ২০ ভাগ বীজের সাশ্রয় হয়।

সেচ প্রয়োগ :


ভালো ফলনের জন্য মাটির প্রকার ভেদে ২-৩টি সেচের প্রয়োজন হয়।

কিন্তু অধিক বেলেমাটিতে আরও অতিরিক্ত ১-২টি সেচের প্রয়োজন হতে পারে।

চারার বয়স ১৭-২১ দিন হলে অর্থাৎ চারার তিন পাতা অবস্থায় প্রথম সেচ দিতে হবে।

শীষ বের হওয়ার সময়ে অর্থাৎ বপনের ৫০-৫৫ দিন পর দ্বিতীয় সেচ দিতে হবে এবং দানা গঠনের সময় অর্থাৎ বপনের ৭০-৭৫ দিন পর তৃতীয় সেচ দিতে হবে।

পরিচর্যা :


বীজ বপনের পর ১০-১২ দিন পর্যন্ত পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রথম সেচের পর জমিতে জো এলে নিড়ানি দিয়ে মাটি আলগা এবং আগাছা তোলার ব্যবস্থা করতে হবে।

বীজ বপনের ১ মাসের মধ্যে আগাছা দমন করা উচিত।

রোগ, পোকা ও ইঁদুর দমন :


অন্য ফসলের তুলনায় গমে রোগবালাই খুব কম হয়।

পাতার দাগ ও মরিচা রোগ- গমের এ প্রধান রোগ দুটি নতুন জাতগুলোতে কম হয়। তবে কোনো কারণে রোগ দুটি দেখা দিলে টিল্ট ২৫০ ইসি ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি মিশিয়ে শীষ বের হওয়ার সময় একবার এবং ১৫ দিন পর আর একবার স্প্রে করতে হবে।

গম ক্ষেতে জাব পোকার আক্রমণ দেখা দিলে ১২.৫ লিটার পানিতে চা চামচের চার চামচ ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। গম ক্ষেতে মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে ডায়াজিনন ৬০ ইসি একই মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

আরো পড়ুন: পেঁপে চাষ করার পদ্ধতি

ফসল সংগ্রহ :


গম পেকে হলুদ বর্ণ ধারণ করলে চৈত্র মাসের প্রথম থেকে মধ্য পর্যন্ত সময়ে তা কেটে সংগ্রহ করতে হবে।

ফলন :


উপযুক্ত যত নিলে একরপ্রতি ১৫০০ থেকে ২০০০ কেজি পর্যন্ত গমের ফলন পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *