করলা চাষ পদ্ধতি

করলা চাষ পদ্ধতি: করলা একটি রুচিকর ও পুষ্টিকর গ্রীষ্মকালীন সবজি। করলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, যা হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে। এতে আছে যথেষ্ট পরিমাণে বিটা ক্যারোটিন। এ বিটা ক্যারোটিন চোখের দৃষ্টি ভালো রাখে এবং চোখের নানা সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে।

করলা চাষ পদ্ধতি:

মাটি :


জল জমেনা এ ধরনের প্রায় সব রকমের মাটিতেই করলার চাষ করা যায়। তবে জৈব পদার্থযুক্ত দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি করলা চাষের জন্য বেশি উপযোগী।

জলবায়ু :


বাংলাদেশের আবহাওয়া করলা চাষের জন্য উপযোগী। উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় করলা ভালো জন্মে। তবে ফুল আসার সময় অত্যাধিক বৃষ্টিপাতে ফল ধরা ব্যাহত হয়।

জাত :


বাংলাদেশে করলার বেশ কয়েকটি উচ্চফলনশীল জাত রয়েছে।

করলা-১: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট কৃর্তক উদ্ভাবিত বারি করলা-১ একটি উচ্চফলনশীল জাত। এ জাতের একটি গাছে ২০-৩০টি করলা ধরে। হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ৩০ টন।

বিএডিসির গজ: বিএডিসির গজ করলা নামের রয়েছে একটি উচ্চফলনশীল করলার জাত। এ জাতের একটি গাছে ১৫-২০টি ফল ধরে। হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ২৫ টন।

এসব ছাড়াও করলার আছে বেশ কয়েকটি হাইব্রিড জাত। যেমন : বুলবুলি, টিয়া, প্যারট, কাকলি, তাজ-৮৮, গ্রিনস্টার, গৌরব, প্রাইড-১, প্রাইড-২, গ্রিন রকেট, হীরক, মানিক, জয়, রাজা, প্রাচী ইত্যাদি।

জমি তৈরি :

৪ থেকে ৫টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে করলার জন্য জমি তৈরি করতে হবে।

বেড ও মাদা তৈরি :

মই দিয়ে জমি সমান করার পর ১ মিটার চওড়া করে বেড তৈরি করে তার মধ্যে ৩০ সেমি চওড়া করে নালা কাটতে হবে। জমি যতটুকু লম্বা তত টুকু লম্বা বেড তৈরি করতে হবে।

আরো পড়ুনঃ আদা চাষ পদ্ধতি

খুব বেশি লম্বা হলে জমি খ- করা যেতে পারে। করলার জন্য ১.৫ মিটার দূরে দূরে মাদা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি মাদার সাইজ হবে দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে ও গভীরতায় ৩০ সেমি। বীজ বপনের ৭ থেকে ১০ দিন আগে মাদায় পচা গোবর ও মাদার মাটির সঙ্গে সার মিশিয়ে দিতে হবে।

করলা বীজ:


বীজের পরিমাণ: সাধারণত প্রতি শতকে করলা চাষের জন্য ১৫ থেকে ২০ গ্রাম এবং প্রতি হেক্টরে ৩-৪ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।

বীজ বপনের সময়: করলার বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হলো ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস। তবে আগাম ফসলের জন্য ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে করলার বীজ বপন করা যায়।

বীজ বপন: করলার বীজের ত্বক শক্ত ও পুরু। তাই দ্রুত অঙ্কুরোদগমের জন্য বপনের আগে ৪৮ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে।

প্রতিটি মাদায় ৩-৪টি করে বীজ ২ থেকে ৩ সেমি গভীরতায় বপন করে ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

সেচ ও নিকাশ:

করলার জমিতে রসের অভাব হলে দুই বেডে মাঝখানের নালা দিয়ে সেচ দিতে হবে। বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে পানি জমার সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা :

  1. করলা গাছ বড় না হওয়া পর্যন্ত আগাছা দমন করতে হবে।
  2. প্রতি মাদায় ২টি করে চারা রেখে বাকি চারাগুলো তুলে ফেলতে হবে।
  3. করলার চারা ১০-১৫ সেমি লম্বা হলে গাছের গোড়ার কাছাকাছি মাটিতে বাঁশের কঞ্চি বা কাঠি পুঁতে একদিকে কাত করে বেঁধে দিতে হবে।
  4. এরপর গাছ ৫০ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা হলে ১.৫ মিটার উঁচু করে মাচা তৈরি করে দিতে হবে।
  5. এছাড়া মাঝে মধ্যে মাটি কুপিয়ে আলগা করে গাছের গোড়ায় মাটি দিয়ে উঁচু করে দিতে হবে এবং জমিতে আর্দ্রতা রক্ষায় করলা গাছের গোড়ায় জাবড়া দিতে হবে।

পোকা দমন (করলা চাষ পদ্ধতি):


করলা গাছে তেমন বেশি পোকা-মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায় না। তবে ফলের মাছি পোকা, লাল কুমড়া বিটল ও কাঁঠালে পোকার আক্রমণ হতে পারে।

আরো পড়ুনঃ গাজর চাষ পদ্ধতি

ফলের মাছি পোকা:

স্ত্রী মাছি পোকা কচি ফলের গায়ে ২-৫টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে পোকার কিড়াগুলো আক্রান্ত ফলে ভেতর ঢুকে এবং ফলের শাঁস খায়। আক্রান্ত ফল অকালে ঝরে পড়ে।

পোকা দমন:

  1. আক্রান্ত ফল কিড়াসহ সংগ্রহ করে মাটির গভীরে পুঁতে ফেলতে হবে।
  2. বিষটোপ ও ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে।
  3. একটি মাটির পাত্রে ১০০ গ্রাম থেতলানো মিষ্টি কুমড়ার সঙ্গে ০.২৫ গ্রাম সেভিন ৮৫ ডাবিস্নউপি মিশিয়ে বিষটোপ তৈরি করতে হবে।
  4. বিষটোপ ৩-৪ দিন পর পর পরিবর্তন করতে হবে।
  5. আক্রমণ বেশি হলে রিপকর্ড বা সিমবুশ ২০ ইসি প্রতিলিটার পানির সঙ্গে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

লাল কুমড়া বিটল:

পূর্ণ বয়স্ক পোকা পাতা ও ফল খেয়ে ফেলে।

পোকা দমন:

  1. এ পোকা দমনের জন্য জমি সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
  2. হাত দিয়ে পোকা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে।
  3. এছাড়া জমিতে সুমিথিয়ন বা ফলিথিয়ন জাতীয় কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

প্রতিকার:

রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম থিয়োভিট মিশিয়ে ১০-১৫ দিন অন্তর স্প্র্রে করতে হবে।

ডাউনি মিলডিউ:

পাতার ওপর ছোট ছোট হলুদ দাগ পড়ে। পাতা ঝলসে ও কুচকে যায়। পাতার নিচে গোলাপি দাগ দেখা যায়।

প্রতিকার:

রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ২ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ মিশিয়ে গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্র্রে করতে হবে।

আরো পড়ুনঃ পালং শাক চাষ পদ্ধতি

ফসল সংগ্রহ:

বীজ বপনের ৫০-৬০ দিন পর গাছে ফল ধরে। ফল ধরার ১২-১৫ দিন পর করলা সংগ্রহ করতে হয়।

ফলন:

ভালোভাবে যত্ন নিলে হেক্টরপ্রতি ১২-১৫ টন পর্যন্ত করলার ফলন পাওয়া যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *