আদা চাষ পদ্ধতি

আদা চাষ পদ্ধতি: আদা আমাদের দেশে মসলা হিসাবে ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়। মসলা ছাড়াও আদা নানা রকমের ঔষধ তৈরির কাজে লাগে। আদা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় চাষ করা হয়। শতকরা ৫০ ভাগ স্টার্চ, ১.২ ভাগ উদ্বায়ী তেল এবং বিভিন্ন পরিমানে প্রোটিন, রেজিন প্রভৃতি উপাদান থাকে।

পরিচিতি:


বাংলা নামঃ আদা
ইংরেজী নামঃ Ginger
বৈজ্ঞানিক নামঃ Zingiber officinale
পরিবারঃ Zingiberaceae

আদা চাষ পদ্ধতি:

জাত:


স্থানীয়, চাইনিজ জিনজার।

জলবায়ু:


আদার জন্যে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া দরকার। অল্প ছায়া আছে এমন জায়গায় আদা ভাল হয়। আদা বৃষ্টির পানিতেই চাষ হয়। সমুদ্রের সমতলবর্তী অঞ্চল থেকে শুরু করে ১৫০০ মিটার উঁচু পার্বত্য অঞ্চলেও এর চাষ হতে পারে।

মাটি উঁচু বেলে-দোআঁশ, বেলে ও এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে আদা ভাল হয়। জমিতে পানি নিকাশের ভাল ব্যবস্থা থাকা দরকার। কারন জমিতে পানি জমে থাকলে আদা পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

আরো পড়ুন: কলা চাষ পদ্ধতি

জমি তৈরি:


আদার জমি খুব ঝুরঝুরে করে তৈরি করা দরকার। ৬-৮ বার কর্ষন ও তারপর মই দিয়ে ভাল ভাবে মাটি তৈরি করে নিতে হবে। এ সময়ে হেক্টরে ১৫০০০ কেজি গোবর সার বা আবর্জনা পচা সার মাটির সঙ্গে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

বীজ বপন:

(ক) বীজ বোনার সময়
সেচের সুবিধা থাকলে বৈশাখ মাসে আদা লাগানো যায়। কিন্তু অসেচ এলাকায় জ্যৈষ্ঠ মাসে আদা লাগানো যায়।

(খ) বীজ আদা শোধন
৭৫-৮০ লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম এমিসন-৬ বা বাগালল -৬ বা ভেগল-৬ বা ডাইথেন-৪৫ গুলে তাতে এক কুইন্টাল বীজ আদা এক মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে।

তারপর পানি থেকে বীজ আদা তুলে ছায়ায় শুকিয়ে নিয়ে লাগাতে হবে। আদা লাগাবার আগে একটি ঝুড়িতে কিছু খড় বিছিয়ে ছোট ছোট আদা তার উপর বিছিয়ে খড় বা থলে দিয়ে সেগুলিকে ঢেকে রাখলে আদার ‘কল’ বের হবে এবং এরকম আদা লাগালে তাড়াতাড়ি গাছ বেরুবে।

(গ) বোনার পদ্ধতি
সরু লাঙল বা কোদাল দিয়ে ৫০-৫৫ সেমি দূরে দূরে নালি কেটে তাতে ১৫-১৭.৫ সেমি দূরে দূরে দু-তিনটে চোখসহ আদার টুকরো লাগাতে হবে।

যে অঞ্চলে বৃষ্টি বেশি এবং মাটি এটেল অথবা সেচ দিয়ে আদা চাষ করা হয়, সেখানে ঐ একই দূরত্বে কোদাল দিয়ে ভেলি তৈরি করে তাতে আদা লাগানো হয়।

(ঘ) বীজের পরিমান
হেক্টর প্রতি ২.০ টন আদা লাগে। আদা অল্প ছায়াযুক্ত জায়গায় ভালো হয় বলে জমির ধারে ছায়া দেওয়া গাছ লাগিয়ে রাখতে হয়।

সার প্রয়োগ:


আদার ভাল ফলন পেতে হলে শেষ চাষের আগে হেক্টর প্রতি ৭০-৭৫ কেজি ইউরিয়া, ১৭৫ কেজি টি.এস.পি, ৫৫ কেজি পটাশ সার দিতে হবে।

আদা লাগানোর এক মাস পরে ৭০-৭৫ কেজি ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ হিসাবে দিতে হবে।

পরিচর্যা:


আদা লাগানোর ১৫-২০ দিনের মধ্যে গাছ বের হয়। দু-তিন বার নিড়ানি দিয়ে আগাছা তুলে নিতে হবে। গাছ কিছুটা বড় হলে গাছের গোড়ায় মাটি দিয়ে ভেলি বেধে দিতে হবে।

এর ফলে যে নালা তৈরি হবে, তা পানি সেচ ও পানি নিকাশের কাজে লাগবে।

সেচ (আদা চাষ পদ্ধতি):


ভাল ফলনের জন্যে আদা জমির মাটি সরস থাকা দরকার। সেজন্যে ৮-১০ দিন অন্তর অন্তর সেচ দিতে হবে। সময় মত বৃষ্টি না হলে বা খরা চললে সেচ দেওয়া একান্ত দরকার।

শুধু লক্ষ্য রাখতে হবে যেন মাটি অতিরিক্ত শুকিয়ে না যায় বা পানিতে জল দাড়িয়ে না যায়।

বালাইদমন:


আদায় কোন মারাত্মক ধরনের রোগ-পোকার উপদ্রব দেখা যায় না। তবে বর্ষা বেশি হলে রাইজোম পচা রোগ হতে পারে। জমিতে এ রোগ হলে গুদাম ঘরের আদায় পচন হতে পারে।

এমিসন-৬ বা বাগালাল-৬ বা ডাইথেন এম-৪৫ দ্রবণে আদা শোধন করে সংরক্ষন করতে হবে। এতে রোগের প্রকোপ কমে। তবে ক্ষেত থেকে তোলার পর পরই এদেরকে একদিন ভালভাবে রোদ দিয়ে নিলে এবং বর্ষা মৌসুমে মাঝে মাঝে ১/২ ঘন্টা রোদে রেখে সংরক্ষন করলে গুদামজাত করার জন্য ঔষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না।

আরো পড়ুন: সুন চাষ পদ্ধতি

ফসল তোলা:


বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে লাগানো আদা পৌষ মাসে তোলার উপযোগী হয়। গাছের পাতা হলদে হলেও ডাঁটা শুকোতে শুরু করলে ফসল তোলা যাবে। কোদাল দিয়ে খুঁড়ে আদা তোলা উচিত। আদা তুলে মাটি পরিষ্কার করে সংরক্ষন করতে হবে।

ফলন:


হেক্টর প্রতি ২০ টন আদা হয়। আদা শোধন করলে ও শুকোলে শতকরা ২৫-৩০ ভাগ আদা পাওয়া যায়।

আদা সংরক্ষন:


আদা সারা বছর ধরে পাওয়ার জন্যে সহজেই সংরক্ষন করা যায়।

লবন, এসিটিক অ্যাসিড পটাশিয়াম মেটাবাই সালফেটের মিশ্রণে আদা ডুবিয়ে রাখলে আদা সারা বছর সরস থাকে।

সাধারনত ৫০ গ্রাম লবন, এক গ্রাম অ্যাসিড (গাঢ় ভিনিগার), এক গ্রাম পটাশিয়াম মেটাসালফেট এক লিটার পানিতে মিশিয়ে এই মিশ্রন তৈরি করা হয়।

এক কেজি আদার জন্যে এই মিশ্রন থেকে সোয়া লিটার দরকার।

সংরক্ষনের জন্যে ভাল বাছাই করা পাকা আদা পানিতে ধুয়ে ও খোসা ছাড়িয়ে টুকরো করে নিতে হবে।

এক টুকরো আদা বয়ামের গলা পর্যন্ত ভরে আগের মিশ্রণটির পরিমাণ মতো দিয়ে বয়ামের মুখে ছিপি লাগিয়ে দিতে হবে।

ছিপি বা ঢাকনা দিয়ে যাতে বাতাস না ঢোকে তার জন্যে এর মুখ মোম দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে।

এরপর ঠান্ডা অন্ধকার জায়গার রেখে দিতে হবে।

এভাবে সংরক্ষিত আদা এক বছর ধরে ব্যবহার করা যায়।

ব্যবহারের আগে আদা ধোয়ার দরকার নেই।

আরো পড়ুন: গম চাষ পদ্ধতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *